এক হাতে দুই হাজারেরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন তাও কোনো সার্জন ফি না নিয়ে। অর্থমূল্যে যার পরিমাণ কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। মানবসেবাকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা এই বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম।
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালে সফলভাবে সম্পন্ন হয় তাঁর নেতৃত্বে ২ হাজারতম কিডনি প্রতিস্থাপন। দেশে এ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া মোট কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে তাঁর তত্ত্বাবধানে।
৯৬ শতাংশ সফলতা, ২১ সদস্যের দক্ষ টিম:
ডা. কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে ১১ জন চিকিৎসকসহ ২১ সদস্যের একটি বিশেষায়িত টিম ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসছে। এ পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া অস্ত্রোপচারের সফলতার হার প্রায় ৯৬ শতাংশ—যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিদেশে ৫০ লাখ, দেশে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার
যেখানে বিদেশে কিডনি প্রতিস্থাপনে ব্যয় হয় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা, সেখানে সিকেডি হাসপাতালে সব মিলিয়ে খরচ মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে প্রতিস্থাপনের পর রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসা, ভিজিট, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। ভর্তি রোগীদের জন্য রয়েছে ফ্রি খাবারের ব্যবস্থাও।
৪০০ টাকা ফি তাও অনেকের জন্য ফ্রি:
অধ্যাপক হয়েও ডা. কামরুল ইসলাম নিয়মিত রোগী দেখেন মাত্র ৪০০ টাকা ফি’তে। তবে অসচ্ছল রোগীদের কাছ থেকে অনেক সময় কোনো ভিজিটই নেন না। তাঁর ভাষায়,
“ভিজিট দিতে পারলে নিলাম, না পারলে নিলাম না। একটা দুইটা না নিলে কিছু আসে যায় না।”
তিনি বলেন, রোগীর কষ্ট লাঘব, মানসিক চাপ কমানো এবং বিপদ থেকে উদ্ধার করাই তাঁর চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। এই কাজকে তিনি এমনভাবে করতে চান, যেন সেটি ইবাদতে পরিণত হয়।
নিজের টাকায় গড়া হাসপাতাল:
২০১৪ সালে নিজের সঞ্চিত অর্থ ও বন্ধুদের সহায়তায় রাজধানীর শ্যামলীতে গড়ে তোলেন সিকেডি হাসপাতাল। বর্তমানে এখানে ৪৫০ জনের বেশি কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ২০০ জনের বেশি স্টাফের আবাসন ব্যবস্থা করেছেন তিনি নিজ উদ্যোগে। স্টাফ ও ভর্তি রোগীদের জন্য দিনে তিন বেলা খাবারও দেওয়া হয় বিনামূল্যে।
রোগীদের আস্থার ঠিকানা:
একজন রোগী বলেন,
“কামরুল স্যার না থাকলে আমাকে ভারতে যেতে হতো। প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল।”
আরেক রোগীর ভাষায়, “ভারত, কলকাতা, চেন্নাই—অনেক জায়গায় দেখিয়েছি। কিন্তু কামরুল স্যারের মতো আস্থা কোথাও পাইনি।”
মায়ের শিক্ষা, মানবতার পথচলা:
ডা. কামরুল ইসলামের মানবিক হয়ে ওঠার পেছনে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর মা অধ্যাপিকা রহিমা খাতুন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে একাই বড় করেছেন চার সন্তানকে। ছেলের সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন,
“আমি শুধু চেয়েছি, ও যেন মানুষের উপকার করেই বেঁচে থাকে।”
মানবসেবার জীবন্ত উদাহরণ:
একজন হাসপাতালের মালিক হয়েও সাধারণ জীবনযাপনেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন ডা. কামরুল ইসলাম। নিজের আয় ব্যয় করেন মূলত রোগীদের কল্যাণেই। চিকিৎসাকে কেবল পেশা নয়, মানবসেবা হিসেবে গ্রহণ করার বাস্তব ও উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি।
ডা. কামরুল ইসলাম প্রমাণ করেছেন যে মানবসেবা সত্যিই ইবাদত হতে পারে।
সাঈদ হাসান সোহাগ 










