অনেকক্ষন ধরে পার্কে একা একা বসে আছে অর্ণব। বার বার সময় দেখছিল মোবাইলে। তার আশেপাশে কয়েকটা গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। উত্তরের শীতল হাওয়া তার নাক-মুখ ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে দক্ষিণ দিকে। প্রায় আধঘন্টা ধরে অর্ণব অপেক্ষা করছে ইশিতার জন্য। এভাবে মাঝে মাঝে অপেক্ষা করতে তার একদমই ভালো লাগেনা।কিন্তু এখনো এসে পৌছাল না মেয়েটা।
আজ ইশিতার জন্মদিন। তাই খুব ভোরে উঠেই ওর জন্য গিফট নিয়ে চলে এসেছে এখানে। অপেক্ষা করছে ইশিতাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য।অথচ এখনো আসছে না মেয়েটা। বসে বসে অর্ণব স্মৃতিচারণ করতে থাকে। মনে পড়ে যায় সেই প্রথম দেখার কথা।
বাসে করে যাচ্ছিল অর্ণব। সাইন্সল্যাব মোড় থেকে তাড়াহুড়ো করে একটি মেয়ে বাসে উঠল। এসে অর্ণবের পাশের সিটে বসল।মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অর্ণবের অনেক পরিচিত মনে হল। অনেকবার মেয়েটিকে বলতে চেয়েও বলল না।
এক পর্যায়ে বলেই ফেলল,
-আপনাকে আমার অনেক পরিচিত মনে হচ্ছে।
মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,
-কিছু মানুষকে দেখে অনেক পরিচিত মনে হলেও আসলে তারা অচেনাই।
অর্ণব আবারো বলল,
-সত্যিই আপনাকে আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।
মেয়েটি আর কিছু বলল না।
শুধু একটি মুচকি হাসি দিল।
তার পরের স্টপেই মেয়েটি নেমে গেল।
এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই অর্ণব অপেক্ষায় থাকত পাশের সিটটার দিকে তাকিয়ে। সেই অচেনা মানুষটির সাথে আরেকবার দেখা হওয়ার আশায়। সেই চেনা চেনা লাগা মানুষটির জন্য একরকম মায়া কাজ করতে লাগল।
অর্ণব আবারো ঘড়ি দেখল। প্রায় এক ঘন্টার কাছাকাছি হতে চলল।বিরক্ত হয়ে অর্ণব অন্য দিকে তাকালো। কিছুদূরে একটা বেঞ্চে একটা মেয়ে আর একটা ছেলেকে দেখে অর্ণব আবার আনমনা হয়ে গেল।
এই পার্কেই সেই অচেনা মেয়েটার সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল।দূর থেকে দেখেই চিনতে পেরেছিল অর্ণব।কিছুটা অবাকও হয়েছিল। আবার যে কোনো দিন দেখা হবে তা সে আশায়ই করেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে পৃথিবীটা সত্যিই অনেক ছোট। যে বেঞ্চে মেয়েটা বসেছিল তার পাশে গিয়ে দাড়াল কিছুক্ষণ। তারপর দাড়িয়েই কিছুটা সামনে ঝুঁকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,মায়ায় পড়ে গেলে হয়ত ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়,মেয়েটা কিছুটা হকচকিয়ে পাশে ফিরে তাকাল।
-জ্বি আমাকে বলছেন?
কিছুটা ইতস্তত করে অর্ণব বলল,
-চিনতে পেরেছেন আমাকে?
কিছুক্ষণ তাকিয়ে
-কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছিনা।
জোরে হেসে,
-আপনারও তাহলে এখন চেনা চেনা লাগছে!
কিছুটা বিব্রত হলেও হাসি দিয়ে সেটা কাটানোর চেষ্টা করল মেয়েটা।
-কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?
-নাহ
-তাহলে?
-এমনি, এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দের তাই বসে আছি।
-ওহ আচ্ছা, আপনার নামটাই তো জানা হলোনা।
-ইশিতা
-আমি অর্ণব।
অনেক্ষন ধরেই টুকটাক কথা হতে থাকে অর্ণব আর ইশিতার মধ্যে।
ইশিতার ডাকেই ধ্যান ভাঙ্গল অর্ণবের।
-স্যরি, একটু দেরী হয়ে গেল।
অবশেষে প্রায় দেড় ঘন্টা পর ইশিতা এসে হাজির হলো।
ইশিতার উপর খুব রাগ হচ্ছে অর্ণবের। কোনো কান্ডজ্ঞান নেই এই মেয়েটার। তাই বলে এত দেরী! কিন্তু নাহ! আজকে আর রাগ করবে না সে। স্বাভাবিক গলায় বলল, “ইট্স ওকে।বসো” ইশিতা অর্ণবের গা ঘেঁষে বসল। অর্ণব ফিরে বসল ইশিতার দিকে। কিছু তাজা শিউলি ফুল ওর হাতে দিয়ে বলল-
-নাও, এক মুঠো শিউলি ফুলের শুভেচ্ছা। “শুভ জন্মদিন”। তোমার প্রতিটা দিন হোক এই শিউলি ফুলের মত শুভ্র আর সুন্দর।
-ওহ! থ্যাংক ইউ। এতগুলো তাজা ফুল কোথায় পেলে?
অর্ণব হেসে বলল, “তুমি খুশি হয়েছো?”
ইশিতা ঘ্রাণ নিতে নিতে বলল, “হ্যাঁ, অনেক”।
শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ইশিতার খুবই প্রিয়।
দু’হাতে শিউলি ফুল নিয়ে ইশিতা ঘ্রাণ নিতে লাগলো। আর অর্ণব ভীষণ আনমনা হয়ে দেখছে। আজ ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশী সুন্দর দেখাচ্ছে। ও আজ একটা ধবধবে সাদা রঙের থ্রি-পিস পড়েছে। সাথে কমলা রঙের চাদর। যেন একটা জীবন্ত শিউলি ফুলের মত দেখাচ্ছে। যে ফুলে সুবাস নেই, আছে স্নিগ্ধতা।
ইশিতার হাতের শিউলি ফুলগুলোর মতো দু’হাতে ওর শুভ্র গাল দুটি স্পর্শ করতে ইচ্ছে করেছে অর্ণবের, কিন্তু করল না। শুধু চেয়ে চেয়ে জীবন্ত শিউলি ফুলের উচ্ছাস দেখল। অর্ণব আস্তে করে ডাক দিল, “ইশিতা”।ইশিতা ফিরে তাকাল।
-তোমার জন্য কিছু উপহার।
উপহার গুলোর সাথে একটা সুন্দর চিঠিও আছে। ইশিতা দেখল অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে চিঠির খামটা। মনের কথা চিঠিতে লিখে জানাতেই অর্ণব বেশি পছন্দ করে। আর ইশিতাও অর্ণবের রঙ-বেরঙের কালি দিয়ে লেখা চিঠি পড়তে ভালোবাসে। দু’জনেই চুপচাপ বসে আছে।
রক্ত জমা শীতের সকালে কুয়াশার মধ্যে চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে ইশিতার পাশে। এই মুহূর্তটা অর্ণবের কাছে অনেক মূল্যবান। অর্ণব ইশিতাকে বলতে চাইল, “আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।” কিন্তু কেন যেন বলা হল না। নীরবতা কাটিয়ে ইশিতা বলল,
-এখন আমি আসি।
অর্ণব হতাশার সুরে বলল,
-চলে যাবে?
-হ্যাঁ। এখন চলে যাব। তবে আবার আসব। দেখা হবে কোনো এক সকালে।
অর্ণবের দেয়া উপহার আর শিউলি ফুলের শুভেচ্ছা নিয়ে চলে যাচ্ছে ইশিতা। নাহ্! আজ আর ওকে আটকাবে না অর্ণব। কিছু মানুষকে চাইলেও আটকে রাখা যায় না। যে যাবার সে তো যাবেই, রেখে যাবে কিছু স্মৃতিময় অতীত। অর্ণব তখনও বসে আছে আর দেখছে ইশিতার চলে যাওয়ার দৃশ্য।
হাঁটতে হাঁটতে ইশিতা কুয়াশার সাথে মিলিয়ে গেল। আর দেখা যাচ্ছে না অবয়বটা। আস্তে আস্তে উঠে রওনা দিল বাসার দিকে। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় চলে এল। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই মা দৌড়ে এসে বললেন,
-কিরে, এত সকালে কোথায় গিয়েছিলি?
-একটু বাইরে মা, ইশিতার সাথে দেখা করতে।
মা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলের মুখের দিকে।
-কি বলছিস তুই এসব? ইশিতার সাথে মানে… ইশিতা না দুই মাস আগে মারা গেল!
চিৎকার করে অর্ণব বলে উঠল,
-কে বলেছে মা, ইশিতা মরে গেছে? ওতো বেচেঁ আছে। আমার মাঝে বেচেঁ আছে। আমি তো রোজ ওর সাথে কথা বলি। মাঝে মাঝে দেখা করি। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা কখনও মরে না মা, তারা মরে গিয়েও কারও না কারও মাঝে বেচেঁ থাকে। ইশিতা ও বেচেঁ আছে মা… বেচেঁ আছে আমার মাঝে।
আমার মনের গহীনে অবয়ব হয়ে।
গল্পঃ অবয়ব,
লেখক: সুমাইয়া জান্নাত আরা।
সুমাইয়া জান্নাত আরা 










